বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্থলবেষ্টিত হ্রদ কাস্পিয়ান সাগর দ্রুত শুকিয়ে যাচ্ছে, যা রাশিয়া, কাজাখস্তান, তুর্কমিনিস্তান, ইরান এবং আজারবাইজানের জীববৈচিত্র্য ও জীবিকার জন্য গুরুতর হুমকি তৈরি করছে। কাজাখস্তানের আকটাউ বন্দর শহরের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, সাগরের তীররেখা প্রায় ১০০ মিটার পিছিয়ে গেছে, যা এখন স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান।
পরিবেশবিদ ও গবেষকরা আশঙ্কা করছেন, এই হার অব্যাহত থাকলে শতকের শেষ নাগাদ সাগরের পানির স্তর ১৮ মিটার পর্যন্ত কমে যেতে পারে, এবং এটি তার পৃষ্ঠভাগের প্রায় ৩৪ শতাংশ হারাতে পারে। এই বিপর্যয় স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক, বিশেষ করে বিলুপ্তপ্রায় স্টারজন মাছের জন্য, যার ক্যাভিয়ার একসময় স্থানীয় পরিবারের নিত্যসঙ্গী ছিল। পরিবেশবিদ আদিলবেক কোজিবাকভ বলেন, তার শৈশবে ক্যাভিয়ার প্রচুর ছিল, কিন্তু এখন প্রাকৃতিক ক্যাভিয়ার দোকানে পাওয়া যায় না। গবেষকরা জানান, মাত্র ৫ থেকে ১০ মিটার পানির স্তর কমলেও সীল, স্টারজন এবং অন্যান্য প্রজাতি হুমকির মুখে পড়বে।
সংকটের জন্য জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি রাশিয়ার পানিনীতি ও ভলগা নদীতে বাঁধ নির্মাণকে দায়ী করা হচ্ছে। ভলগা নদী কাস্পিয়ানের ৮০-৮৫ শতাংশ পানি সরবরাহ করে, কিন্তু গত দশকে কৃষি ও শিল্পের জন্য অতিরিক্ত পানি ব্যবহার এবং অসংখ্য বাঁধ নির্মাণের ফলে সাগরে পানির প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো সাগরের আশপাশের তেলক্ষেত্র এবং আন্তর্জাতিক কোম্পানির গোপন চুক্তি। কাজাখস্তানের পরিবেশ আইনজীবী ভাদিম নি এই চুক্তিগুলো আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করছে বলে অভিযোগ করেছেন এবং উচ্চ আদালতে মামলা দায়ের করেছেন, যদিও তা এখনো গৃহীত হয়নি। নি বলেন, এই গোপন চুক্তি পরিবেশের ক্ষতি লুকিয়ে রাখছে, এবং তথাকথিত পরিবেশগত গবেষণা প্রায়ই কোম্পানির স্বার্থে পক্ষপাতদুষ্ট। তিনি আরও অভিযোগ করেন, ইউরোপে ‘গ্রিন এনার্জি’ রপ্তানির নামে স্থানীয়রা দূষণ, বর্জ্য ও পানির ঘাটতির মুখোমুখি হচ্ছে।
আকটাউয়ে কোজিবাকভ স্থানীয় প্রশাসন, নাগরিক সমাজ ও জনগণের সঙ্গে কাস্পিয়ান সাগর রক্ষায় কাজ করছেন। তিনি বলেন, “আমরা জানি সাগর শুকিয়ে যাচ্ছে; এটি বোঝার জন্য গবেষণার প্রয়োজন নেই—চোখেই দেখা যায়।” কাস্পিয়ান সাগর শুধু একটি জলাশয় নয়, বরং এটি চীন থেকে ইউরোপের দ্রুততম বাণিজ্য পথ ‘মিডল করিডোর’-এর অংশ এবং তেল-গ্যাসের বিশাল ভাণ্ডার।
অনেকে আশঙ্কা করছেন, কাস্পিয়ান সাগর আরাল সাগরের মতো একই পরিণতির দিকে এগোচ্ছে, যা গত শতকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পানি সেচের ফলে তার ১০ শতাংশে হ্রাস পেয়েছে। কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে কাস্পিয়ান সাগরও ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে যেতে পারে।
ছবির ক্যাপশন (২০২২): কাজাখস্তানের আকটাউয়ের কাছে কাস্পিয়ান সাগরের পিছিয়ে যাওয়া তীররেখা চলমান পরিবেশ সংকটকে তুলে ধরে।
তারিখ: ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৪, আকটাউ বন্দর শহর, কাজাখস্তান
