কক্সবাজারের সব রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যৌন হয়রানি ‘সবচেয়ে বড় উদ্বেগের’ বিষয় হয়ে উঠেছে। রোহিঙ্গা নারী শরণার্থীরা অভিযোগ করেছেন, তারা ক্যাম্পে নিয়মিত আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) সদস্যদের যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে তারা ক্যাম্পের নিরাপত্তায় এপিবিএনের পরিবর্তে সেনাবাহিনী মোতায়েন চাইছেন।রোববার (৩১ আগস্ট) রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের আয়োজনে অনুষ্ঠিত গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ ও সংলাপ অনুষ্ঠানে এসব তথ্য উঠে আসে।
‘আরার হেফাজত’ নামের নারী নিরাপত্তা গবেষণায় উখিয়ার তিনটি রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ৬৬ জন নারী ও কিশোরী এবং স্থানীয় ৩০ জন নারীর সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। অংশগ্রহণকারীদের অধিকাংশই ১৬-৩০ বছর বয়সী।
গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, যৌন হয়রানির পাশাপাশি বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ এখন প্রায় স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। মাত্র ৭ শতাংশ নারী জানিয়েছে যে তারা স্বাধীনভাবে আইনি সহায়তা পেয়ে থাকেন।
অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের পলিসি রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি ম্যানেজার তামাজের আহমেদ গবেষণার মূল তথ্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এপিবিএন সদস্যদের আচরণে রোহিঙ্গা নারীরা চরমভাবে ত্যক্তবিরক্ত। তাদের অভিযোগ, অনেক সময় সদস্যরা সুন্দরী নারীদের লক্ষ্য করে বিভিন্ন অজুহাতে হঠাৎ বাড়িতে প্রবেশ করে এবং তারা তখন যৌন হয়রানি বা নিপীড়নের শিকার হন।
তামাজের আহমেদ আরও জানান, শুরুতে এপিবিএনের আচরণ এমন ছিল না। কিন্তু ধীরে ধীরে তারা ঘুস, চাঁদাবাজি, যৌন হয়রানি ও নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে। এ কারণে রোহিঙ্গা নারীরা এপিবিএন অপসারণ করে সব ক্যাম্পে সেনাবাহিনী মোতায়েনের অনুরোধ জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, একসময় কিছুদিনের জন্য একটি ক্যাম্পে সেনাবাহিনী নিয়োজিত ছিল। তখন নারীরা নিজেদের নিরাপদ মনে করেছিলেন। অন্য ক্যাম্পের নারীরাও এতে একমত হয়েছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ১৬ এপিবিএনের অধিনায়ক মোহাম্মদ কাউছার সিকদার বলেন, গত নয় মাস ধরে আমি এখানে আছি। এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে আমাদের কাছে কোনো অভিযোগ আসেনি।
অ্যাকশনএইডের গবেষণায় বলা হয়, গবেষণায় অংশগ্রহণকারী নারীদের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই (৪৮ শতাংশ) মনে করেন, পুরুষ ও ছেলেদের জন্য কাউন্সেলিং জরুরি। এর পাশাপাশি রোহিঙ্গা শিবিরে গড়ে ওঠা সশস্ত্র গোষ্ঠীর দৌরাত্ম্য এবং মাদকের বিস্তার তাদের নিরাপত্তা ও সুস্থতাকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
এছাড়া প্রত্যাবাসনের ভবিষ্যৎ বিষয়ে বেশিরভাগ নারী ও কিশোরী (ক্যাম্পভেদে ৫০-৮২ শতাংশ) মিয়ানমারে নিরাপদে প্রত্যাবাসনের আগ্রহ প্রকাশ করেন, তবে অপেক্ষাকৃত কম বয়সীরা তৃতীয় কোনো দেশে অভিবাসনের কথা বলেন।
এ পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গা নারী ও মেয়েদের জন্য অবিলম্বে জেন্ডার-সংবেদনশীল সুরক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের প্রয়োজন বলে গবেষণায় সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া রোহিঙ্গা সংকটে মানবিক সাড়া দেওয়া, জলবায়ু কার্যক্রম এবং শান্তি-সম্প্রীতি নিশ্চিত করার জন্য একটি সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া অত্যাবশ্যক বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
‘আরার হেফাজত: রোহিঙ্গা নারী ও কিশোরীদের কণ্ঠস্বর মাধ্যমে তাদের সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা’ শীর্ষক এ অনুষ্ঠানে সরকারি সংস্থা, জাতিসংঘ, দূতাবাস, স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা, দাতা সংস্থা, গবেষক, বিশেষজ্ঞ এবং গণমাধ্যম প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
রোহিঙ্গা নারী ও কিশোরী মেয়েদের সুরক্ষার বিষয়ে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর জোর দিয়ে বক্তারা বলেন, এ গবেষণার ফলাফল শুধু একটি তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন নয়, বরং এটি রোহিঙ্গা শরণার্থী নারীদের কণ্ঠস্বর, যা তাদের বাস্তব জীবনের চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরে।
তারা বলেন, রোহিঙ্গা সংকটকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখা যাবে না; এটি সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে সমন্বিতভাবে মোকাবিলা করতে হবে। বাল্যবিবাহ, লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা এবং নারীর চলাচলের সীমাবদ্ধতা শুধু পুরুষতান্ত্রিকতার কারণে নয়, ক্যাম্পে নিরাপত্তাহীনতা ও মৌলিক চাহিদা পূরণের সীমাবদ্ধতার কারণে ঘটছে।
তারা মনে করেন, ক্যাম্পে নারীবান্ধব, যথাযথ আলোর ব্যবস্থাসহ পৃথক শৌচাগার ও গোসলের স্থান নিশ্চিত করা, নারী নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ এবং নারী নেতৃত্বাধীন সুরক্ষা কমিটি গঠন করা জরুরি। সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাব কমাতে স্বাধীন আইনি সহায়তা ডেস্ক স্থাপন এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন।
পাশাপাশি, পুরুষ ও ছেলেদের জন্য সচেতনতা ও কাউন্সেলিং কর্মসূচি চালু করা এবং নারীবান্ধব স্থান, শিক্ষা ও জীবিকার সুযোগ বৃদ্ধি করে তাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ, যা ঝুঁকি হ্রাসে সাহায্য করবে বলেও আলোচনায় উঠে আসে।
একশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির একটি সংলাপ পরিচালনা করেন। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা নারী ও কিশোরীরা বহুমুখী ঝুঁকির মুখে রয়েছে। তাদের কণ্ঠস্বর দেখাচ্ছে, এখনই দীর্ঘমেয়াদি, অধিকারভিত্তিক ও জেন্ডার-সংবেদনশীল উদ্যোগ নেওয়া জরুরি, যা তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করবে। নীতিনির্ধারক ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য এটি স্পষ্ট বার্তা।
Sunday, August 31, 2025
Author: DhakaGate Desk
Note For Readers: The CEO handles all legal and staff issues. Claiming human help before the first hearing isn't part of our rules. Our system uses humans and AI, including freelance journalists, editors, and reporters. The CEO can confirm if your issue involves a person or AI.
এ সম্পর্কিত আরও খবর
- ফেইসবুক মন্তব্য