Sunday, August 17, 2025

বড় গ্যাসফিল্ডের উৎপাদন কমছে, বাড়ছে শঙ্কা

দেশে প্রতিনিয়ত কমছে প্রাকৃতিক গ্যাসের পরিমাণ। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে গ্যাসের উৎপাদন কমেছে প্রায় ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট, যা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গ্যাসের পরিমাণ বাড়াতে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হলেও, বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ ক্ষেত্রে বড় ধরনের উন্নতির জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও সময় প্রয়োজন।

সূত্র জানায়, বিগত সরকার প্রাকৃতিক গ্যাস ও তেল অনুসন্ধানের পরিবর্তে আমদানির ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল। ফলে দেশীয় গ্যাস খাতে ধস নামলেও তা সামাল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৫ হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি, কিন্তু ১৩ আগস্ট পর্যন্ত তারা সরবরাহ করতে পেরেছে (এলএনজিসহ) ২ হাজার ৮৩২ মিলিয়ন ঘনফুট।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাস খাতে যথাযথ পদক্ষেপ না নেওয়া হলে ভবিষ্যতে দেশ বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। **গ্যাস উৎপাদনের চিত্র** পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি মালিকানাধীন ২২টি গ্যাসফিল্ড থেকে এ বছর গড়ে উৎপাদন হয়েছে ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস, যেখানে গত বছর একই সময়ে উৎপাদিত হয়েছিল ১ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট। বৃহৎ গ্যাসফিল্ড তিতাসের ২৬টি গ্যাসকূপ থেকে এ বছর উৎপাদন হচ্ছে ৩১৯ মিলিয়ন ঘনফুট, যেখানে গত বছর ছিল ৩৭৮ মিলিয়ন ঘনফুট। হবিগঞ্জ গ্যাসফিল্ডের উৎপাদন ১১৬ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে কমে ৯০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমেছে। রশীদপুর গ্যাসফিল্ডের উৎপাদনও ৬৯ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে কমে ৬১ মিলিয়ন ঘনফুটে দাঁড়িয়েছে। কিছু গ্যাসকূপে উৎপাদন বাড়ানো হলেও তা পর্যাপ্ত নয়। শেভরনের মালিকানাধীন বৃহৎ গ্যাসফিল্ড বিবিয়ানার উৎপাদনও উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। গত বছর এই ফিল্ড থেকে গড়ে ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলিত হলেও এখন তা কমে ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমেছে। জালালাবাদ গ্যাসফিল্ডের উৎপাদনও ১৫২ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে কমে ১৩৭ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমেছে। **এলএনজির মাধ্যমে ভারসাম্য আনার চেষ্টা** প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎপাদন কমে যাওয়ায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এলএনজি আমদানির মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। বর্তমানে দেশে ১১০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি সরবরাহের সক্ষমতা রয়েছে। গত বছর এই সক্ষমতায় ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ করা হয়েছিল, আর এ বছর তা বাড়িয়ে ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট করা হয়েছে। অর্থাৎ, গ্যাসের চাহিদার একটি বড় অংশ আমদানির মাধ্যমে মেটানো হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, ক্রমবর্ধমান গ্যাসের চাহিদার কারণে মজুত কমছে, ফলে উৎপাদনও হ্রাস পাচ্ছে। এ অবস্থায় গ্যাসকূপের মুখে কম্প্রেসার বসিয়ে উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে বিগত সরকার আমদানির ওপর জোর দেওয়ায় উৎপাদন বৃদ্ধিতে পর্যাপ্ত মনোযোগ দেওয়া হয়নি। আওয়ামী লীগ সরকার মহেশখালীতে তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল, পায়রাতে ভাসমান টার্মিনাল, ভোমরা-খুলনা গ্যাস পাইপলাইন, বেনাপোল-খুলনা পাইপলাইনের মাধ্যমে ভারত থেকে গ্যাস আমদানি, এবং ভোলা-বরিশাল-খুলনা পাইপলাইন নির্মাণ প্রকল্প হাতে নিয়েছিল। বিশেষ বিধানের আওতায় সামিট গ্রুপের সঙ্গে মহেশখালীতে ভাড়াভিত্তিক ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল এবং পায়রাতে মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জির সঙ্গে চুক্তি চূড়ান্ত পর্যায়ে ছিল। তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিশেষ বিধান আইন বাতিল করে এসব প্রকল্প বন্ধ করে দিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে গ্যাসের অবস্থার দ্রুত উন্নতি সম্ভব হচ্ছে না। একটি নতুন গ্যাসকূপ আবিষ্কার থেকে উৎপাদনে আনতে তিন বছর সময় লাগে, আর একটি ল্যান্ডবেইজ এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনে লাগে প্রায় সাত মাস। বিবিয়ানাসহ বড় গ্যাসফিল্ডের মজুত আশঙ্কাজনকভাবে কমছে। এ অবস্থায় কোনো কারণে উৎপাদনে বড় ধরনের ধস দেখা দিলে দেশের গ্যাস পরিস্থিতি মারাত্মক বিপর্যয়ে পড়তে পারে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ইজাজ হোসেন ঢাকা পোস্টকে বলেন, প্রাকৃতিক গ্যাসের এই সংকট দীর্ঘদিন ধরে চলছে। বিগত সরকার অনুসন্ধানের পরিবর্তে আমদানির ওপর জোর দিয়েছিল, যা একটি ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। পরে তারা অনুসন্ধানের উদ্যোগ নিয়েছিল। তিনি বলেন, বর্তমানে গ্যাস খাতের পরিস্থিতি স্বস্তিদায়ক নয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ১০০ গ্যাসকূপ খননের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা একটি ভালো উদ্যোগ। তবে তাদের মেয়াদে তা সম্ভব হবে না। পরবর্তী সরকারের উচিত এই কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান ঢাকা পোস্টকে বলেন, গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে আমরা অনুসন্ধান করছি, যদিও তা সময়সাপেক্ষ। তবে ওয়ার্কওভারের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানো হচ্ছে। তিনি বলেন, গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে সময়ের প্রয়োজন। আমাদের সময়ে তা সম্ভব নাও হতে পারে। তাই আমরা গ্যাস ও বিদ্যুতের জন্য রোডম্যাপ তৈরি করছি, যাতে ভবিষ্যৎ সরকার তা বাস্তবায়ন করতে পারে।

Share This Post

শেয়ার করুন

Author:

Note For Readers: The CEO handles all legal and staff issues. Claiming human help before the first hearing isn't part of our rules. Our system uses humans and AI, including freelance journalists, editors, and reporters. The CEO can confirm if your issue involves a person or AI.