Tuesday, August 5, 2025

কোটা আন্দোলন থেকে গণ-অভ্যুত্থান – বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন

ঢাকা, ৫ আগস্ট ২০২৫ – আজ বাংলাদেশের সমসাময়িক ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিনের প্রথম বার্ষিকী। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-নেতৃত্বাধীন কোটা সংস্কার আন্দোলন একটি গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়, যার ফলে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। সাড়ে ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটিয়ে এই দিনে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশত্যাগে বাধ্য হন। তবে এই বিজয় কোনো হঠাৎ ঘটনা ছিল না—এর পেছনে ছিল দীর্ঘ প্রতিরোধ, রক্তের মূল্য, আত্মত্যাগ এবং এক অবিস্মরণীয় গণ-অভ্যুত্থান।

**কোটা সঙ্কটের সূচনা** ২০২৪ সালের ৫ জুন হাইকোর্ট ২০১৮ সালের সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিলের পরিপত্রকে অবৈধ ঘোষণা করে। পরদিন, ৬ জুন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভে নামে। ৯ জুন আন্দোলন তীব্র হয়, এবং শিক্ষার্থীরা ৩০ জুন পর্যন্ত দাবি মানার আলটিমেটাম দেয়। আন্দোলন ধীরে ধীরে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছড়িয়ে পড়ে। শাহবাগ, জাহাঙ্গীরনগর, রেললাইন, মহাসড়ক—সব জায়গায় শুরু হয় অবরোধ। **‘বাংলা ব্লকেড’: প্রতিরোধের নতুন অধ্যায়** আন্দোলন দেশব্যাপী রূপ নেয়, বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, স্কুল, এমনকি মাদরাসাও এতে শামিল হয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে শিক্ষার্থীরা ‘বাংলা ব্লকেড’ ঘোষণা করে, যা ৭ জুলাই রাজধানীকে অচল করে দেয়। ৮ জুলাই একটি কেন্দ্রীয় সমন্বয় টিম গঠিত হয়, যা আন্দোলনে নতুন গতি এনে দেয়। **‘তুমি কে? আমি কে?’ – দেশের জাগরণ** ১৪ জুলাই শেখ হাসিনা এক সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ‘রাজাকারের বংশধর’ বলে কটাক্ষ করেন। এর প্রতিবাদে রাতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো উত্তাল হয়ে ওঠে। “তুমি কে? আমি কে? রাজাকার, রাজাকার!” স্লোগানটি দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে, এবং আন্দোলন আরো তীব্র হয়। ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ জোরদার হয়। **রক্তে লেখা অধ্যায়: আবু সাঈদ ও ১৬ জুলাই** ১৬ জুলাই রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশের গুলিতে নিহত হন ইংরেজি বিভাগের ছাত্র আবু সাঈদ। তার বুক পেতে গুলি খাওয়ার দৃশ্য সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে ক্ষোভ ও ঐক্যের জন্ম হয়। একই দিনে চট্টগ্রামে ওয়াসীম, শান্ত, ফারুক এবং ঢাকায় শাহজাহানসহ আরো কয়েকজন নিহত হন। আন্দোলন জাতীয় প্রতিরোধে রূপ নেয়। **কারফিউ, ইন্টারনেট শাটডাউন ও প্রবাসীদের সমর্থন** ১৮ জুলাই ছাত্রদের ডাকে দেশব্যাপী ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ শুরু হয়। সরকার মোবাইল ও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট বন্ধ করে দেশকে অন্ধ করে তোলে এবং কারফিউ জারি করে। তবু আন্দোলন থামেনি; প্রবাসী বাংলাদেশীরা টেকনিক্যাল সহায়তা দিয়ে আন্দোলনের পাশে দাঁড়ায়। **হত্যাকাণ্ড ও অটল প্রতিরোধ** ১৯ জুলাই বিজিবি ও পুলিশের হামলায় দুই শতাধিক ছাত্র ও জনতা নিহত হন। হেলিকপ্টার থেকে গুলি করে শিশু রিয়াসহ আরো অনেকে নিহত হন। ২৯ জুলাই শেখ হাসিনা জামায়াত নিষিদ্ধের ঘোষণা দেন, যা আন্দোলন দমনের রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখা হয়। **আগস্ট: শোক নয়, প্রতিরোধের সূর্য** সরকারের ‘শোকের আগস্ট’ প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলনকারীরা ‘জুলাই বীর দিবস’ পালন করে। ২ আগস্ট থেকে ‘শেখ হাসিনার পদত্যাগ চাই’ এক দফা আন্দোলন শুরু হয়। লাল কাপড় বাঁধা মিছিল, শহীদদের জন্য কফিন মিছিল ও গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। **৫ আগস্ট: এক দফা, এক দাবি** ৫ আগস্ট সকাল ১০টায় ‘মার্চ টু ঢাকা’ শুরু হয়। লাখো মানুষ ঢাকায় জড়ো হন। পুলিশের গুলিতে অনেকে নিহত হলেও সেনাবাহিনী গুলি চালাতে অস্বীকৃতি জানায়। দুপুর ১টা ৩০ মিনিটে শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানার ভারতে পালানোর খবর ছড়ায়। বেলা ২টা ৩০ মিনিটে তার পদত্যাগের ঘোষণা প্রচারিত হয়। *নয়া দিগন্ত*’র প্রতিবেদনে বলা হয়, বিজয় সরণিতে বিক্ষুব্ধ জনতা শেখ মুজিবুর রহমানের মূর্তির গলায় দড়ি দিয়ে ভেঙে ফেলে। **অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সূচনা** ৮ আগস্ট রাতে নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে শপথ নেন। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও অর্থনীতি পুনর্গঠনের লক্ষ্যে একটি উপদেষ্টা পরিষদ গঠিত হয়। **যন্ত্রণাময় বিজয়** গণভবনে বিজয়ী জনতার ঢল, রাস্তায় সিজদা, মিষ্টি বিতরণ ও কোলাকুলির মধ্যে বিজয় উদযাপিত হয়। তবে সহস্রাধিক শহীদ ও আহতদের পরিবারে নেমে আসে শোক। ৬ আগস্ট থেকে বন্দী নেতাকর্মীদের মুক্তি শুরু হয়। **ইতিহাসের নতুন অধ্যায়** আবু সাঈদ, তামীম, রিয়াসহ শত শত শহীদের রক্তে লেখা হয় এক নতুন ইতিহাস। ৫ আগস্ট শুধু একটি তারিখ নয়—এটি গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও সম্মিলিত প্রতিরোধের প্রতীক।

Share This Post

শেয়ার করুন

Author:

Note For Readers: The CEO handles all legal and staff issues. Claiming human help before the first hearing isn't part of our rules. Our system uses humans and AI, including freelance journalists, editors, and reporters. The CEO can confirm if your issue involves a person or AI.