ঢাকা, ৫ আগস্ট ২০২৫ – রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে আয়োজিত জুলাই পুনর্জাগরণ অনুষ্ঠানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বহুল প্রত্যাশিত ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ পাঠ করেছেন। এই ঘোষণাপত্রে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের শহীদদের ‘জাতীয় বীর’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, যা ছাত্র-জনতার দীর্ঘদিনের দাবি ছিল।
২৮ দফা বিশিষ্ট এই ঘোষণাপত্র ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে বিজয়ী বাংলাদেশের জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। এতে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানকে রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া হবে এবং আগামী নির্বাচনে নির্বাচিত সরকারের সংস্কারকৃত সংবিধানের তফসিলে এই ঘোষণাপত্র সন্নিবেশিত হবে। ৫ আগস্ট ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের বিজয়ের প্রতিফলন হিসেবে এই ঘোষণাপত্র প্রণয়ন করা হয়েছে।
**জুলাই ঘোষণাপত্রের মূল বিষয়বস্তু:**
১. এই ভূখণ্ডের মানুষ উপনিবেশ বিরোধী লড়াইয়ের ধারাবাহিকতায় পাকিস্তানের স্বৈরশাসকদের বঞ্চনা ও শোষণের বিরুদ্ধে ২৩ বছর রুখে দাঁড়িয়ে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণা করে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করে।
২. জনগণ স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে উল্লিখিত সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচারের ভিত্তিতে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছে।
৩. ১৯৭২ সালের সংবিধানের দুর্বলতা ও অপপ্রয়োগের কারণে আওয়ামী লীগ সরকার মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হয় এবং গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা ক্ষুণ্ন করে।
৪. স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগ সরকার বাকশালের নামে একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করে মতপ্রকাশ ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা হরণ করে, যার প্রতিক্রিয়ায় ১৯৭৫ সালে সিপাহী-জনতার বিপ্লব ঘটে এবং বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তিত হয়।
৫. আশির দশকে সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে নয় বছরের সংগ্রামের পর ১৯৯০ সালে গণঅভ্যুত্থান ঘটে এবং ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তিত হয়।
৬. দেশী-বিদেশী চক্রান্তে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়, এবং ১/১১-এর ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনের পথ সুগম হয়।
৭. গত ১৬ বছরে অবৈধ সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে একদলীয় ফ্যাসিবাদী শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়।
৮. শেখ হাসিনার দুঃশাসন, গুম-খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করে।
৯. হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ একটি ফ্যাসিবাদী, মাফিয়া ও ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হয়, আন্তর্জাতিকভাবে ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়।
১০. তথাকথিত উন্নয়নের নামে দুর্নীতি, ব্যাংক লুট, অর্থ পাচার ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের মাধ্যমে দেশের সম্ভাবনা বিপর্যস্ত হয় এবং পরিবেশ ও জলবায়ু বিপন্ন হয়।
১১. গত ১৬ বছর ধরে জনগণ গণতান্ত্রিক সংগ্রামে জেল-জুলুম, গুম-খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়।
১২. বিদেশী প্রভুত্বের বিরুদ্ধে ন্যায়সংগত আন্দোলনকে আওয়ামী লীগ সরকার নিষ্ঠুরভাবে দমন করে।
১৩. ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের প্রহসনের নির্বাচনে জনগণ ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়।
১৪. ভিন্নমতের নেতা-কর্মী, শিক্ষার্থী ও তরুণদের নির্যাতন এবং কোটাভিত্তিক বৈষম্য জনগণের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করে।
১৫. বিরোধী দলের উপর নিপীড়নের ফলে জনরোষ তৈরি হয় এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াই অব্যাহত থাকে।
১৬. কোটাব্যবস্থা বিলোপ ও দুর্নীতি প্রতিরোধে ছাত্র আন্দোলনের সময় সরকারের দমন-পীড়ন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়।
১৭. ফ্যাসিস্ট শক্তির বিরুদ্ধে সমাজের সকল স্তরের মানুষের অংশগ্রহণে প্রায় এক হাজার মানুষ হত্যার শিকার হয় এবং সামরিক বাহিনী গণতান্ত্রিক লড়াইয়ে সমর্থন দেয়।
১৮. অসহযোগ আন্দোলন ও ৫ আগস্টের লংমার্চের মুখে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ত্যাগে বাধ্য হন।
১৯. গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে জনগণের সার্বভৌমত্ব রাজনৈতিক ও আইনগতভাবে বৈধ এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত।
২০. দ্বাদশ জাতীয় সংসদ ভেঙে দেওয়া হয় এবং ৮ আগস্ট ২০২৪-এ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়।
২১. গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদ, বৈষম্য ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনের অভিপ্রায় প্রকাশিত হয়।
২২. সুশাসন, সুষ্ঠু নির্বাচন, আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সংবিধান ও প্রতিষ্ঠানের সংস্কারের অভিপ্রায় ব্যক্ত হয়।
২৩. ফ্যাসিস্ট সরকারের গুম-খুন, গণহত্যা ও সম্পত্তি লুণ্ঠনের বিচারের দাবি উত্থাপিত হয়।
২৪. জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদদের জাতীয় বীর ঘোষণা এবং তাদের পরিবার ও আহতদের আইনি সুরক্ষার অঙ্গীকার।
২৫. সুষ্ঠু নির্বাচন ও সংস্কারের মাধ্যমে দুর্নীতি ও বৈষম্যমুক্ত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের অভিপ্রায়।
২৬. পরিবেশ ও জলবায়ু সহিষ্ণু টেকসই উন্নয়ন কৌশলের মাধ্যমে অধিকার সংরক্ষণের প্রত্যাশা।
২৭. ছাত্র-গণঅভ্যুত্থান ২০২৪-এর স্বীকৃতি এবং সংস্কারকৃত সংবিধানে ঘোষণাপত্র সন্নিবেশের অঙ্গীকার।
২৮. ৫ আগস্ট ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হিসেবে ঘোষণাপত্র প্রণয়ন।
এই ঘোষণাপত্র বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক, ন্যায়বিচারপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ভবিষ্যতের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক, যা পরিবর্তনের জন্য সংগ্রামকারীদের ত্যাগকে সম্মান জানায়।
Note For Readers:
The CEO handles all legal and staff issues. Claiming human help before the first hearing isn't part of our rules.
Our system uses humans and AI, including freelance journalists, editors, and reporters.
The CEO can confirm if your issue involves a person or AI.