কুষ্টিয়া, ১৯ জুন ২০২৫ – কেএনবি এগ্রো ফিড লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী এস এম কামরুজ্জামান নাসির এবং অগ্রণী ব্যাংকের বড়বাজার শাখার তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ১৩ কোটি টাকার এলসি (Letter of Credit) জালিয়াতি ও বৈদেশিক মুদ্রা পাচারের অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্ত কর্মকর্তারা হলেন কুষ্টিয়া অঞ্চলের উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) সাবিনা সুলতানা, বড়বাজার শাখার ব্যবস্থাপক সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) এনামুল হক এবং বৈদেশিক বাণিজ্য বিভাগের কর্মকর্তা তানভীর।
বিষয়টি প্রকাশ পাওয়ার পর ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তদন্ত শুরু করে এবং একটি বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করে। ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় বড়বাজার শাখাকে চিঠি দিয়ে তিন দিনের মধ্যে ৯ লাখ ৭১ হাজার ৩৭০ দশমিক ৫৮ মার্কিন ডলার সমপরিমাণ টাকা ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে, যা শাখার কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন।
ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, এলসি সুবিধা পেতে গ্রাহককে শতভাগ মার্জিন জমা দিতে হয় এবং ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো (সিআইবি) রিপোর্ট সংগ্রহ বাধ্যতামূলক। কিন্তু এই জালিয়াতিতে এই নিয়মগুলো মানা হয়নি। কামরুজ্জামান নাসির ঋণখেলাপি হওয়া সত্ত্বেও তা গোপন রেখে তাকে অবৈধভাবে এলসি সুবিধা দেওয়া হয়। তিন কর্মকর্তা একযোগে নিয়ম লঙ্ঘন করে প্রায় ১২ কোটি ৫৯ লাখ টাকার এলসি অনুমোদন করেন।
সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৯ জানুয়ারি থেকে ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত ১৯টি এলসি খোলা হয়, যার মাধ্যমে ১২ লাখ ৪৩ হাজার ৪৫৭ মার্কিন ডলার (প্রায় ১২ কোটি ৫৯ লাখ টাকা) বিদেশে পাঠানো হয়। এই অর্থের বিপরীতে কোনো জামানত রাখা হয়নি, এবং তা এখনো ফেরত আসেনি। প্রধান কার্যালয়ের অনুমতি ছাড়াই সুইফট মেসেজের মাধ্যমে বিল পরিশোধ করা হয়, যা নিয়মবহির্ভূত। এতে ডিজিএম সাবিনা সুলতানা এবং এজিএম এনামুল হক জড়িত বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এজিএম এনামুল হক দাবি করেন, এলসি সুবিধা নিয়ম মেনেই দেওয়া হয়েছিল এবং তখন কামরুজ্জামান কোনো খেলাপি ছিলেন না। তবে, অনুসন্ধানে জানা যায়, কেএনবি এগ্রো ফিড সিটি ব্যাংকের কুষ্টিয়া শাখা এবং আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের দিলকুশা শাখায় ঋণখেলাপি। আল-আরাফাহ ব্যাংক সূত্র জানায়, ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে কেএনবি এগ্রো ফিড ২৩০ কোটি টাকার ঋণ নেয়, যার সুদসহ মোট পরিমাণ ২৩৫ কোটি টাকার বেশি। এই ঋণ নিয়ে অর্থঋণ আদালতে একাধিক মামলা চলমান। সিটি ব্যাংক সূত্র জানায়, কেএনবি এগ্রো ফিড এবং কেএনবি ফ্লাওয়ার মিলস—দুটি প্রতিষ্ঠানই তাদের শাখায় ঋণখেলাপি, যার মালিক কামরুজ্জামান নাসির।
সাবিনা সুলতানা পূর্বে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখায় দায়িত্ব পালনকালে একই ব্যক্তির নামে অ্যাকাউন্ট খুলে নিয়মবহির্ভূত ঋণ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি জানান, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া তিনি কিছু বলবেন না। তানভীর, যিনি ১৫ মে ২০২৫-এ কুষ্টিয়া পৌরবাজার শাখায় বদলি হন, তার বিরুদ্ধে পূর্বে দুটি শাখায় ঋণ জালিয়াতির অভিযোগ রয়েছে, এবং তার নামে অডিট আপত্তি এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। তিনি ক্যাশ অফিসার হলেও তাকে বৈদেশিক বাণিজ্য বিভাগের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
নতুন কর্মকর্তা বড়বাজার শাখায় যোগ দিয়ে নিয়মবহির্ভূত এলসি খোলার বিষয়টি ধরতে পারেন এবং এজিএম ও ডিজিএমকে জানান। তারা বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন এবং কেএনবি এগ্রো ফিডের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সমাধান না হওয়ায় বিষয়টি খুলনা বিভাগীয় জেনারেল ম্যানেজারের কাছে পৌঁছায়, যিনি তদন্ত কমিটি গঠন করেন।
অগ্রণী ব্যাংকের খুলনা বিভাগের জেনারেল ম্যানেজার সামছুল আলম জানান, বিষয়টি তাদের জানা আছে এবং তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছে। শিগগির তা জমা দেওয়া হবে, এবং প্রতিবেদন পাওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কেএনবি এগ্রো ফিডের জেনারেল ম্যানেজার জাহিদুল ইসলাম জানান, এলসি বা ঋণের বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না, এসব বিষয় মালিক দেখাশোনা করেন। কামরুজ্জামান নাসিরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
এই ঘটনা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে শাসন ও নিয়মানুসরণ নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এ ধরনের জালিয়াতি রোধে আরও কঠোর তদারকির দাবি উঠেছে।
