ঢাকার রথযাত্রা শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্যের এক অনন্য ধারক। ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু হওয়া এই উৎসব পুরান ঢাকার সাংস্কৃতিক জীবনে এক গভীর প্রভাব ফেলেছে। ইতিহাস বলে, ১৭৫৭ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ শাসনকালে ঢাকা সিটিতে দুটি রথযাত্রা প্রচলিত ছিল। তাঁতীবাজারের শ্রীশ্রী জগন্নাথ জিউ ঠাকুর মন্দির থেকে জগন্নাথদেবের রথ এবং নবাবপুরের রথখোলা থেকে লক্ষ্মী-নারায়ণের রথ টানা হতো। তাঁতীবাজারের রথযাত্রা আজও অব্যাহত আছে, যদিও ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনী জগন্নাথদেবের রথ পুড়িয়ে দিয়েছিল। স্বাধীনতার পর নতুন রথ তৈরি করে এই ঐতিহ্য পুনরুজ্জীবিত করা হয়। নবাবপুরের রথযাত্রা ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত চললেও এখন আর প্রচলিত নেই।
ঢাকায় রথযাত্রার ঐতিহ্য ও সমসাময়িক আয়োজন
তাঁতীবাজারের শ্রীশ্রী জগন্নাথ জিউ ঠাকুর মন্দির কমিটির প্রধান নির্বাহী বাবুল দাস বলেন, “ব্রিটিশ আমল থেকে তাঁতীবাজারে জগন্নাথদেবের রথযাত্রা শুরু হয়, যা এখনো ভক্তদের ভালোবাসায় চলমান।” তিনি আরও জানান, পূর্ব পাকিস্তানে ধামরাইয়ে যশোমাধবের রথযাত্রা ব্রিটিশ আমল থেকে উৎসবমুখর পরিবেশে পালিত হতো এবং এখনো তা অব্যাহত আছে।
ইসকন বাংলাদেশের উদ্যোগে ১৯৮৯ সালে ওয়ারী মন্দির থেকে নারিন্দার গৌড়ীয় মঠে রথযাত্রা শুরু হয়। ১৯৯২ সালে প্রথমবারের মতো রথ ওয়ারী মন্দির থেকে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে নেওয়া হয়। ইসকনের সাধারণ সম্পাদক চারুচন্দ্র দাস ব্রহ্মচারী বলেন, “১৯৯৬ সাল থেকে তিনটি রথ টানা শুরু হয় এবং ২০০০ সাল থেকে স্বামীবাগ আশ্রম থেকে ঢাকেশ্বরী মন্দির পর্যন্ত রথযাত্রা চলমান রয়েছে।” তিনি জানান, ফোল্ডিং রথের প্রচলন এই উৎসবকে আরও আকর্ষণীয় করেছে, যা হাজার হাজার ভক্তের সমাগম ঘটায়।
প্রতি বছর আষাঢ়ের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে সনাতনী রীতি অনুযায়ী এই রথযাত্রা পালিত হয়। এবার রাজধানীতে মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির তত্ত্বাবধানে দশটি রথ টানা হবে। স্কন্দপুরাণ অনুসারে, সত্যযুগে মহারাজ ইন্দ্রদ্যুম্ন জগন্নাথদেবের শ্রীবিগ্রহ প্রতিষ্ঠার সময় থেকে এই উৎসবের সূচনা। ভারতের উড়িষ্যার পুরী জগন্নাথ মন্দির থেকে শুরু হওয়া এই ঐতিহ্য এখন বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। পুরান ঢাকার এই বর্ণিল আয়োজন সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক অপূর্ব মেলবন্ধন।
এ.আই/এম.আর
