ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে হোয়াইট হাউসে বৈঠক করেন, ৭ জুলাই, ওয়াশিংটন ডিসি।
গাজায় চলমান যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক জনমত ধীরে ধীরে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছে। বিভিন্ন দেশ এই জনমতের প্রতিফলন ঘটিয়ে ইসরায়েলের নিন্দা জানাচ্ছে। গত কয়েক সপ্তাহে একাধিক পশ্চিমা দেশ ইসরায়েলি মন্ত্রীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও কানাডা এক যৌথ বিবৃতিতে গাজার "অসহনীয় মানবিক বিপর্যয়ের" নিন্দা জানিয়েছে।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে গ্লোবাল সাউথভুক্ত কয়েকটি দেশ, যারা সম্মিলিতভাবে ‘দ্য হেগ গ্রুপ’ নামে পরিচিত, অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের হামলা রোধে বেশ কিছু ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। সম্প্রতি গাজার একটি ক্যাথলিক গির্জায় ইসরায়েলি হামলার পর ধর্মীয় নেতারাও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছেন। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সাধারণ মানুষের প্রতিবাদও বাড়ছে।
তাহলে কি ইসরায়েলকে থামাতে আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি হচ্ছে? আসুন বিস্তারিত জানি:
### দ্য হেগ গ্রুপ
তাদের নিজস্ব ওয়েবসাইট অনুযায়ী, দ্য হেগ গ্রুপ একটি আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রীয় জোট, যারা আন্তর্জাতিক আইন রক্ষা এবং ফিলিস্তিনিদের পাশে থাকার জন্য ‘সমন্বিত কূটনৈতিক ও আইনি পদক্ষেপ’ নিতে অঙ্গীকারবদ্ধ। এই জোটে রয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকা, বলিভিয়া, কলম্বিয়া, কিউবা, হন্ডুরাস, মালয়েশিয়া, নামিবিয়া ও সেনেগাল। তাদের লক্ষ্য জাতিসংঘ সনদের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক আইন ও মানুষের মৌলিক অধিকার, বিশেষ করে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, রক্ষা করা।
এই সপ্তাহে কলম্বিয়ার রাজধানী বোগোটায় এই গ্রুপ একটি বৈঠক আয়োজন করে। এতে চীন, স্পেন, কাতারসহ প্রায় ৩০টি দেশ অংশ নেয়। জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি ফ্রানচেসকা আলবানিজ এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন এবং এটিকে "গত ২০ মাসের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অগ্রগতি" বলে উল্লেখ করেন।
মার্সিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন সম্প্রতি জাতিসংঘের বিশেষ দূত ফ্রানচেসকা আলবানিজের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে, কারণ তিনি গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের অভিযানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে প্রতিবেদন দিয়েছেন।
দুই দিনের এই সম্মেলন শেষে ১২টি দেশ ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে ছয়টি পদক্ষেপের ব্যাপারে সম্মত হয়। এর মধ্যে রয়েছে ইসরায়েলে অস্ত্র সরবরাহে নিষেধাজ্ঞা, অস্ত্রবাহী জাহাজের চলাচলে বাধা প্রদান এবং ইসরায়েলি দখলদারি থেকে উপকৃত প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সরকারি চুক্তি পর্যালোচনা।
### কোন দেশগুলো ব্যবস্থা নিয়েছে
গত বুধবার স্লোভেনিয়া ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির ও চরমপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচকে তাদের ভূখণ্ডে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর কারণ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ মোকাবিলায় ব্যর্থ হয়েছে। গত জুনে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড, যুক্তরাজ্য ও নরওয়ে এই দুই মন্ত্রীর বিরুদ্ধে সহিংসতায় উসকানি ও গাজায় অবৈধ ইহুদি বসতি সম্প্রসারণের অভিযোগে নিষেধাজ্ঞা জারি করে।
গত মে মাসে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও কানাডা যৌথ বিবৃতিতে ইসরায়েলের গাজা অভিযানকে "সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ" বলে নিন্দা জানায় এবং হামলা বন্ধ না করলে "জোরালো পদক্ষেপ" নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেয়। যুক্তরাজ্য কিছু বসতি স্থাপনকারী সংস্থার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এবং ইসরায়েলের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য আলোচনায় "বিরতি" ঘোষণা করে। তুরস্ক মে মাসে জানায়, গাজায় মানবিক পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত তারা ইসরায়েলের সঙ্গে সব বাণিজ্য বন্ধ রাখবে।
২০২৩ সালের ডিসেম্বরে দক্ষিণ আফ্রিকা আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ এনে মামলা করে, যাকে সমর্থন জানায় কলম্বিয়া, চিলি, স্পেন, আয়ারল্যান্ড ও তুরস্ক। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে আইসিজে একটি অস্থায়ী রায়ে বলে, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার "সম্ভাব্য ভিত্তি" রয়েছে এবং মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করতে জরুরি পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দেয়, যা ইসরায়েল ২০২৫ সালের মার্চ থেকে বন্ধ করে রেখেছে।
*জেরুজালেমের লাতিন প্যাট্রিয়ার্ক আর্চবিশপ পিয়েরবাত্তিস্তা পিৎজাবাল্লা ও গ্রিক অর্থোডক্স প্যাট্রিয়ার্ক তৃতীয় থিওফিলস গাজার হলি ফ্যামিলি চার্চ পরিদর্শন করেন, ১৮ জুলাই।*
*ছবি: রয়টার্স*
### ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আরও সমালোচনা
গত বৃহস্পতিবার গাজা শহরের হলি ফ্যামিলি গির্জায় ইসরায়েলের বোমা হামলায় তিনজন নিহত হন, যার জন্য ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্রও নিন্দা জানিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নেতানিয়াহুর সঙ্গে একটি "ক্ষুব্ধ" ফোনালাপ করেন, যার পর নেতানিয়াহুর কার্যালয় হামলার জন্য "গভীর দুঃখ" প্রকাশ করে। ইসরায়েলি হামলায় গাজায় এ পর্যন্ত ৫৮ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু।
### বিশ্বজুড়ে ইসরায়েলের বিরোধিতা
গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী গণবিক্ষোভ চলছে। ইসরায়েলের বর্বরতা এবং ফিলিস্তিনিদের ওপর এর প্রভাব দেখে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ক্ষোভ বাড়ছে। পশ্চিম ইউরোপে গত জুনে ইউগভের এক জরিপে দেখা গেছে, ইসরায়েলের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নজিরবিহীনভাবে কমে গেছে। মার্কিন সম্প্রচারমাধ্যম সিএনএন-এর একটি সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ২৩ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন গাজায় ইসরায়েলের পদক্ষেপ "সম্পূর্ণ ন্যায্য," যা ২০২৩ সালের অক্টোবরে ছিল ৫০ শতাংশ।
ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বিভিন্ন সংগীত উৎসবে ছড়িয়ে পড়েছে। জার্মানির ফিউশন ফেস্টিভ্যাল, পোল্যান্ডের ওপেন’আর ফেস্টিভ্যাল এবং যুক্তরাজ্যের গ্লাস্টোনবেরি ফেস্টিভ্যালে শিল্পী ও দর্শকেরা গাজা যুদ্ধের নিন্দা জানিয়েছেন।
### ইসরায়েলের ভেতরে পরিবর্তন
ইসরায়েলে যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ এখনো ছোট আকারে রয়েছে, তবে তা বাড়ছে। ‘স্ট্যান্ডিং টুগেদার’ নামের একটি সংগঠন ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনি নাগরিকদের একত্র করে আন্দোলন করছে। গত এপ্রিলে ইসরায়েলি সাময়িকী *+৯৭২*-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এক লাখের বেশি ইসরায়েলি রিজার্ভ সেনা দায়িত্ব পালন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সেনাবাহিনীর ভেতর থেকেও খোলাচিঠির মাধ্যমে যুদ্ধবিরোধী বার্তা দেওয়া হচ্ছে।
### সম্ভাব্য ফলাফল
দেশীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে অজনপ্রিয় হলেও নেতানিয়াহুর কট্টরপন্থী জোট সরকার গাজায় ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। সরকারের সর্বশেষ প্রস্তাবে গাজার সব মানুষকে একটি তথাকথিত "মানবিক শহরে" আটকে রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে, যাকে অনেকে "কনসেনট্রেশন ক্যাম্প" বলে তুলনা করেছেন। এটিকে ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক আইন ও বিশ্ব মতামতের প্রতি উপেক্ষার প্রমাণ হিসেবে দেখছেন সমালোচকরা।
গাজার একমাত্র ক্যাথলিক গির্জায় বোমা হামলার জন্য সাম্প্রতিক সমালোচনা সত্ত্বেও, যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন এখনো ইসরায়েলের জন্য দৃঢ় রয়েছে। জাতিসংঘে ভেটো, সামরিক সহায়তা এবং ইসরায়েলের সমালোচকদের (যেমন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত—আইসিসি) ওপর নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে কূটনৈতিক সুরক্ষা দিচ্ছে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে হয়ে পড়লে ইসরায়েলের জন্য অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা মোকাবিলা করা আরও কঠিন হতে পারে।
Note For Readers:
The CEO handles all legal and staff issues. Claiming human help before the first hearing isn't part of our rules.
Our system uses humans and AI, including freelance journalists, editors, and reporters.
The CEO can confirm if your issue involves a person or AI.