Friday, August 22, 2025

বাংলাদেশি পোশাক খাতে দুই মাসে ক্রয়াদেশ বেড়েছে ৩২ শতাংশ

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কনীতির ফলে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিদেশি ক্রেতারা ধীরে ধীরে নয়াদিল্লি, ইসলামাবাদ ও বেইজিং থেকে মুখ ফিরিয়ে এখন লাল-সবুজের পতাকার দিকে ঝুঁকছেন। এছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের ক্রেতারা নতুন ক্রয়াদেশ নিয়ে ঢাকায় আসছেন, ফলে তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতে ক্রয়াদেশ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ), বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ), রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) এবং শীর্ষস্থানীয় পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো জানিয়েছে, এ খাতে নতুন সম্ভাবনা জেগে উঠেছে। চলতি আগস্টের প্রথম সপ্তাহ থেকে বিশ্ববাজারের ক্রেতারা বাংলাদেশে নতুন রপ্তানি আদেশ দেওয়ার জন্য প্রবল আগ্রহ দেখাচ্ছেন। এ ধারা অব্যাহত থাকলে সেপ্টেম্বর থেকে ক্রয়াদেশ দ্বিগুণ হতে পারে।

খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, গত দুই মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ক্রয়াদেশ প্রায় ৩২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসে মোট রপ্তানি আয়ে ২৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, জুলাই মাসে কেবল পোশাক খাত থেকে রপ্তানি আয় ছিল ৩৯৬ কোটি ডলার, যা দেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৮৩ শতাংশ। ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন জানান, ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী রপ্তানি আদেশ গ্রহণ ও সময়মতো শিপমেন্ট সম্পন্ন হলে চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ বা তার চেয়েও বেশি হতে পারে। এই গতি অব্যাহত থাকলে আট মাসের মধ্যে রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করা সম্ভব। তিনি আরও জানান, শুধু তৈরি পোশাক নয়, চীন ও ভারত থেকে পূর্বে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানিকৃত অন্যান্য পণ্যের ক্রেতারাও এখন বাংলাদেশের দিকে ঝুঁকছেন। উদ্যোক্তারা যদি তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারেন, তবে এই ক্রেতারা স্থায়ীভাবে বাংলাদেশমুখী হতে পারেন। তবে, এর জন্য দ্রুত বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকট সমাধান ও বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানান, গত ছয়-সাত মাস ধরে অনেক ক্রেতা চীনের পরিবর্তে ভারতে তাদের আমদানি আদেশ স্থানান্তর করছিলেন, কারণ তারা আগেই অনুমান করেছিলেন যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারে চীনের রপ্তানিকারকদের কঠিন সময়ের মুখোমুখি হতে হবে। তবে, ভারতের ওপর হঠাৎ বাড়তি মার্কিন শুল্ক আরোপ এই প্রবণতা বদলে দিয়েছে। এছাড়া চীনের পোশাক কারখানাগুলোতে শ্রমিক সংকটের কারণে বাংলাদেশ এই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারবে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, বর্তমান চাহিদা অনুযায়ী সব রপ্তানি আদেশ বাস্তবায়ন করা গেলে চলতি অর্থবছরে রপ্তানি খাতে ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব। তবে, শিল্পে বিনিয়োগ ও উৎপাদন প্রবাহ এখনো কিছুটা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতের কারণে। তিনি বলেন, ব্যাংকগুলো বর্তমানে পুনরুদ্ধার মোডে রয়েছে এবং ঋণ আদায়ে মরিয়া। কিন্তু বহু বছরের অনিয়ম ও লুটপাটের সমস্যা রাতারাতি সমাধান সম্ভব নয়। ঋণের সুদহার বাড়ানো বা ঋণ প্রবাহ কমানোর মাধ্যমে ব্যবসা সম্প্রসারণ সম্ভব নয়। তিনি জানান, সহনীয় নীতির বিপরীতে গিয়ে রাজস্ব আয় বাড়ানো যেমন সম্ভব নয়, তেমনি উদ্যোক্তাদের আতঙ্কিত করে ঋণ আদায়ও সম্ভব নয়। বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল জানান, সাধারণত জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে রপ্তানি তুলনামূলক কম হয়। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। রপ্তানি আয় বাড়ছে এবং নতুন নতুন ক্রয়াদেশ আসছে। আগে যেখানে শুধু বড় ক্রেতারা অর্ডার দিতেন, সেখানে গত এক মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারের জন্য ছোট ক্রেতারাও অর্ডার দিতে শুরু করেছেন। এতে গত মাসে রপ্তানিতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য এসেছে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পাল্টা শুল্ক কার্যকর হওয়ার পর সেখানকার ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে বাংলাদেশ ভালো সাড়া পাচ্ছে। চীন ও ভারতের তুলনায় বাংলাদেশ বেশি সুবিধাজনক অবস্থানে থাকায় পণ্যের চাহিদা বেড়েছে।
পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, বাড়তি ক্রয়াদেশ গ্রহণে সতর্ক থাকতে হবে। কোনো অবস্থাতেই মূল্যছাড়ে পণ্য বিক্রি করা উচিত নয়। কারণ, একবার কম দামে পণ্য বিক্রি করলে পরবর্তীতে ক্রেতারা সঠিক দাম দিতে চাইবে না। এতে রপ্তানি আয় বাড়লেও অল্প সময়ের মধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন বন্ধ করে দেনার ফাঁদে পড়তে পারে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের উচিত একটি টাস্কফোর্স গঠন করা।

Share This Post

শেয়ার করুন

Author:

Note For Readers: The CEO handles all legal and staff issues. Claiming human help before the first hearing isn't part of our rules. Our system uses humans and AI, including freelance journalists, editors, and reporters. The CEO can confirm if your issue involves a person or AI.