Sunday, August 3, 2025

ফ্লাইট এক্সপার্ট বন্ধ, টিকিট রিফান্ড নিয়ে আতঙ্ক, ব্যবসায়ীদের কোটি টাকা ঝুঁকিতে

ঢাকা, ৩ আগস্ট ২০২৫ – দেশের শীর্ষস্থানীয় অনলাইন ফ্লাইট টিকিট বুকিং প্ল্যাটফর্ম ‘ফ্লাইট এক্সপার্ট’-এর হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনায় বেশ কিছু ছোট ও মাঝারি টিকিট বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান বিপাকে পড়েছে। শনিবার (২ আগস্ট ২০২৫) সন্ধ্যায় বন্ধের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ঢাকার মতিঝিলে ফ্লাইট এক্সপার্টের কার্যালয়ে ভুক্তভোগীদের ভিড় দেখা গেছে।

অন্তত ৬৯টি প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, তাদের ২৭ কোটি টাকার বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। এছাড়াও আরও অনেক প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। শনিবার প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সোমা ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি বড় টিকিট বিক্রেতা এজেন্সি ফ্লাইট এক্সপার্টের মাধ্যমে আগাম কাটা টিকিট রিফান্ড শুরু করে। এতে ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলো আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। তারা ফ্লাইট এক্সপার্টকে টিকিটের জন্য পরিশোধ করা টাকা ফেরত পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছে।

ভুক্তভোগী আবুল হোসেন বলেন, “সোমা ইন্টারন্যাশনাল কেন শনিবার রাতে অফিসের বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে ভিতরে বসে সব পিএনআর (যাত্রীর নামের রেকর্ড) রিফান্ড করছে? তাদের এ বিষয়ে স্পষ্ট জবাব দিতে হবে। তারা কেন অপেক্ষা করল না বা সবার সাহায্য চাইল না?” তিনি আরও বলেন, “নিশ্চয়ই তারা এই প্রতারণার বিষয়ে জানত। না হলে গোপনে এসব কেন করবে?” ফ্লাইট এক্সপার্ট দেশি-বিদেশি এয়ারলাইন্সের টিকিট বুকিং, হোটেল রিজার্ভেশন, ট্যুর প্যাকেজ এবং ভিসা প্রক্রিয়াকরণের মতো সেবা প্রদান করত। সাশ্রয়ী মূল্যে সহজে টিকিট বুকিংয়ের সুবিধার কারণে প্ল্যাটফর্মটি জনপ্রিয় ছিল। কিন্তু শনিবার হঠাৎ প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে যায়। ফ্লাইট এক্সপার্টের কিছু কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে মালিকপক্ষ দেশ ছেড়েছে। এতে গ্রাহক ও সরবরাহকারীদের কোটি কোটি টাকা ফেরত পাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। তবে ফ্লাইট এক্সপার্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সালমান বিন রশিদ প্রথম আলোকে বলেছেন, টাকা নিয়ে পালানোর অভিযোগ মিথ্যা। শনিবার তিনি কর্মীদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে দেওয়া এক বার্তায় দাবি করেন, তাঁর প্রতিষ্ঠানের দুই কর্মকর্তা তাঁর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। তিনি হুমকি ও অপবাদ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে প্রতিষ্ঠান বন্ধ করছেন এবং দেশ ছাড়ছেন। বন্ধের খবরে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ছোট টিকিট বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো ফ্লাইট এক্সপার্টের মতিঝিল কার্যালয়ে ভিড় করে। ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, রোববার সকাল থেকে বিভিন্ন এয়ারলাইন্সে কাটা অনেক টিকিট যাত্রীদের নামের রেকর্ডে (পিএনআর) আর দেখা যাচ্ছে না। তারা অভিযোগ করেন, সোমা ইন্টারন্যাশনাল টিকিট রিফান্ড শুরু করেছে, এবং হাজী এয়ার ট্রাভেলস সোমবার থেকে রিফান্ড শুরু করবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। সোমা ইন্টারন্যাশনালের ঢাকা কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হলে কর্মকর্তারা জানান, বিষয়টি তাদের সিলেট কার্যালয় থেকে পরিচালিত হচ্ছে, তবে তারা কিছু জানেন না। সিলেট কার্যালয়ে একাধিকবার ফোন করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি। রোববার বিকেলে ভুক্তভোগী প্রতিষ্ঠানের মালিকরা সোমা ইন্টারন্যাশনালের ঢাকা কার্যালয়ে গিয়ে রিফান্ড হওয়া টিকিটের ক্ষতিপূরণ দাবি করেন। ফ্লাইট এক্সপার্টের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক থাকা কোম্পানির সূত্রে জানা গেছে, তারা নিজেদের আইএটিএ নম্বর ছাড়াও মক্কা ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস, সোমা ইন্টারন্যাশনাল, হাজী এয়ার ট্রাভেলস, প্রোমা প্রমুখের আইএটিএ নম্বর ব্যবহার করে টিকিট কাটত। বন্ধের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর এই কোম্পানিগুলোর কেউ কেউ টিকিট রিফান্ড করে টাকা তুলে নেওয়া শুরু করে। এতে ছোট ও মাঝারি এজেন্সিগুলো বিপাকে পড়ে, যারা গ্রাহকদের কাছ থেকে টিকিটের টাকা সংগ্রহ করে ফ্লাইট এক্সপার্টকে পরিশোধ করেছিল। কুমিল্লার একটি ছোট এজেন্সির মালিক মাহমুদ প্রথম আলোকে বলেন, বিভিন্ন এয়ারলাইন্স মিলিয়ে তাঁর ৯টি টিকিট কাটা ছিল, যার মূল্য ৪ লাখ ৩৪ হাজার টাকা। রোববার সকালে তার মধ্যে প্রায় ১ লাখ টাকার দুটি টিকিট বাতিল হয়ে গেছে। তিনি বলেন, “বাকিগুলো নিয়েও শঙ্কায় আছি। ওগুলো বাতিল হলে পথে বসা ছাড়া উপায় নেই।” এজেন্সিগুলো যেন যাত্রীর অনুমতি ছাড়া টিকিট রিফান্ড করতে না পারে, সে বিষয়ে সোমবার মন্ত্রণালয়ে একটি অনুরোধপত্র দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশের (আটাব) সভাপতি আবদুস সালাম আরেফ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, টিকিট বিক্রির পর তার মালিক যাত্রী। কেউ রিফান্ড করলে এবং যাত্রী অভিযোগ করলে সরকার ব্যবস্থা নিতে পারে। তিনি আরও বলেন, ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হচ্ছে, যা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। ফ্লাইট এক্সপার্টের মালিককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি। **আইনি পদক্ষেপ**
শনিবার রাতে মতিঝিল থানায় বিপুল সরকার নামে এক গ্রাহক ফ্লাইট এক্সপার্টের বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মামলা করেন। রাতেই প্রতিষ্ঠানটির তিন কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন—হেড অব ফিন্যান্স সাকিব হোসেন (৩২), চিফ কমার্শিয়াল অফিসার সাঈদ আহমেদ (৪০) এবং চিফ অপারেটিং অফিসার এ কে এম সাদাত হোসেন (৩২)। রোববার ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত তাঁদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। মামলায় পাঁচজনকে আসামি করা হয়েছে, বাকি দুজন হলেন ফ্লাইট এক্সপার্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সালমান বিন রশিদ শাহ সাঈম ও তাঁর বাবা এম এ রাশিদ। মতিঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মেজবাহ উদ্দিন জানান, বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।[

Share This Post

শেয়ার করুন

Author:

Note For Readers: The CEO handles all legal and staff issues. Claiming human help before the first hearing isn't part of our rules. Our system uses humans and AI, including freelance journalists, editors, and reporters. The CEO can confirm if your issue involves a person or AI.