Wednesday, September 3, 2025

চবি শিক্ষার্থী-গ্রামবাসীর সম্প্রীতি ফেরানোই চ্যালেঞ্জ

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) দুই নম্বর ফটক থেকে কিছুদূর গেলে ইমাম বোখারি মাদ্রাসার ফটক। সেই ফটক ধরে আরও কিছুক্ষণ হাঁটলে জোবরা গ্রামের পশ্চিমপাড়া। এই পাড়ার একটি টিনশেড ভাড়া বাসায় থাকেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের প্রায় ১২ শিক্ষার্থী। মঙ্গলবার দুপুর ১২টার দিকে ওই বাসায় গিয়ে দেখা যায়, শিক্ষার্থীরা জিনিসপত্র নিয়ে বের হয়ে যাচ্ছেন। তাদেরই একজন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের জেষন চাকমা। তিনি *কালবেলা*কে বলেন, “স্থানীয়দের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষের পর থেকে বাসায় আর নিরাপদবোধ করছেন না। দুদিন ধরে হলে অবস্থান করছেন। এখন এসে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে যাচ্ছেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার আসবেন।”

একই অবস্থা সমাজতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহরও। তিনি দুই নম্বর ফটকের পাশেই একটি বাসায় থাকেন। দুদিন ধরে তিনিও শহরে এক বন্ধুর বাসায় থাকছেন। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিতে ও সার্বিক অবস্থা দেখতে এসেছেন।

শুধু এই দুজনই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশে বিভিন্ন কটেজ বা মেসে থাকা অধিকাংশ শিক্ষার্থীর অবস্থা এমন। অজানা আতঙ্কে নিরাপত্তার অভাবে তারা বাসা ছেড়ে হল বা শহরে পরিচিত কারও বাসায় গিয়ে থাকছেন। একই পরিস্থিতি জোবরা গ্রামেও। গ্রামের বেশ কয়েকজন ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, তারাও আতঙ্কে আছেন। গ্রেপ্তার বা হামলার আতঙ্কে যুবক বয়সী কেউ রাতে গ্রামে থাকেন না। যৌথ বাহিনীর গাড়ি দেখলেই তারা দৌড়ে লুকিয়ে যান। দুই দিনের সংঘর্ষে উত্তেজনা এখনো পুরোপুরি প্রশমিত হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও স্থানীয় প্রশাসন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে তৎপর হলেও শিক্ষার্থী ও গ্রামবাসীর মধ্যে সম্প্রীতি ফেরানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সম্প্রীতি না ফিরলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা সম্ভব নয়। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বলছেন, শিক্ষার্থী ও গ্রামবাসীর মধ্যে সম্প্রীতি ফেরানো এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। না হলে উত্তেজনা যে কোনো সময় ফের মাথাচাড়া দিতে পারে। এই বিরোধ স্থায়ীভাবে নিরসনের উদ্যোগ নিতে হবে। হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মুমিন বলেন, “দুপক্ষই আমাদের। আমরা গ্রামবাসীকে বোঝানোর চেষ্টা করছি। শিক্ষার্থীদের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে।” বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক কামাল উদ্দিন বলেন, “দুই পক্ষের মধ্যে সম্প্রীতি বাড়াতে আমরা একটি কমিটি গঠন করেছি। কমিটি কাজ শুরু করেছে।” ১৯৬৬ সালে জোবরার পাশে পাহাড় ঘেঁষে প্রতিষ্ঠিত চবি ২,৩১০ একর জায়গাজুড়ে গড়ে উঠেছে। বর্তমানে শিক্ষার্থী সংখ্যা ২৮,৫১৫। তবে আবাসন সুবিধা সীমিত। ১৪টি হল ও একটি হোস্টেলে প্রায় ৯,০০০ শিক্ষার্থী থাকলেও বাকি ১৯,৫০০ শিক্ষার্থীকে ক্যাম্পাসের বাইরে কটেজ, মেস বা শহরে ভাড়া বাসায় থাকতে হয়। **ঘটনা বড় হলো কেন**: শনিবার রাতে দুই নম্বর ফটক এলাকায় এক ছাত্রীকে মারধরের অভিযোগকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ শুরু হয়। রাত সোয়া ১২টা থেকে রোববার দুপুর পর্যন্ত দফায় দফায় সংঘর্ষ ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, প্রশাসন চাইলে ঘটনা রাতেই মীমাংসা করতে পারত। ঘটনা শুরুর প্রায় পৌনে এক ঘণ্টা পর প্রক্টরিয়াল টিম ঘটনাস্থলে আসে। ততক্ষণে পরিস্থিতি অনেক দূর গড়ায়। কয়েকজন ছাত্রনেতা উসকানি দেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ছিল মাত্র কয়েকজন পুলিশ। ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী আয়উবুর রহমান তৌফিক বলেন, “প্রক্টরিয়াল বডি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনুপস্থিতি ঘটনাকে বড় করেছে। সংঘর্ষ শুরু হয়েছে সোয়া ১২টার দিকে। প্রক্টরিয়াল টিম ১টার পর আসে। তাদের বারবার কল দিলেও পাওয়া যায়নি। তারা তাৎক্ষণিকভাবে এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি ও ছাত্র প্রতিনিধিদের নিয়ে মীমাংসা করতে পারত। কিন্তু তারা যখন আসে, তখন ঘটনা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।” বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর সাধারণ সম্পাদক ইয়াসিন আরাফাত বলেন, “ঘটনা বড় হওয়ার জন্য প্রশাসনই দায়ী। শিক্ষার্থীরা দারোয়ানকে ধরে প্রশাসনের হাতে তুলে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু প্রশাসন কল ধরেনি।” তবে সহকারী প্রক্টর বজলুর রহমান এ দাবি নাকচ করে বলেন, “আমরা ঠিক সময়েই গেছি। শিক্ষার্থীরা না জেনেই এসব বলছে।” **জোবরা গ্রামে ক্ষয়ক্ষতি**: দুই নম্বর ফটক থেকে ইমাম বোখারি মাদ্রাসার ফটক পর্যন্ত ভাঙচুরের চিহ্ন স্পষ্ট। নুরুল ইসলাম কোম্পানির গ্যারেজে ৫টি সিএনজি, ৮-৯টি অটোরিকশা, কয়েকটি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করা হয়েছে। কয়েকটিতে আগুনও দেওয়া হয়। নান্নু মিয়ার দোকানে চা-নাশতা ও মুদি মালপত্র বিক্রি হতো। দোকান ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়েছে। নান্নু মিয়ার ছেলে মো. রুকন বলেন, “দোকানে প্রায় ৩ লাখ টাকার মালপত্র ছিল। মালপত্র লুট করে নিয়ে গেছে। ক্যাশ ভেঙে টাকা নিয়েছে। কিছুদিন আগে দেড় লাখ টাকা ঋণ নিয়ে দোকানে মাল তুলেছিলাম। এখন কী করব বুঝতে পারছি না।” ৪০ বছর ধরে রিকশা চালান মোহাম্মদ সিরাজ। তিনি বলেন, “১ লাখ ৩০ হাজার টাকায় রিকশা কিনেছিলাম। শিক্ষার্থীরা ভেঙে দিয়েছে। মেরামত করতে ৬০ হাজার টাকা লাগবে। আমার কাছে ৬০ পয়সাও নেই।” আব্দুল মান্নান দাবি করেন, শিক্ষার্থীরা তার বাড়ি ভাঙচুরের পাশাপাশি ৭ ভরি স্বর্ণ ও ৪ লাখ টাকা নিয়ে গেছে। গ্রামবাসীর দাবি, তারা শিক্ষার্থীদের হামলা করতে ক্যাম্পাসে যায়নি। শিক্ষার্থীরা তাদের গ্রামে ঝামেলা করতে এসেছে। তারা শুধু প্রতিরোধ করেছে।
**কেন বারবার সংঘর্ষ**: বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রক্টর অধ্যাপক আলী আজগর চৌধুরী বলেন, “মনস্তাত্ত্বিক বিষয় এসব ঘটনার পেছনে বড় ভূমিকা রাখে। শিক্ষার্থীরা মনে করে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, আর গ্রামবাসীরা মনে করে বিশ্ববিদ্যালয় তাদের এলাকায়। দুই পক্ষই নিজেদের বড় মনে করে। ছোটখাটো বিষয় থেকে ঘটনা বড় হয়ে যায়। তাৎক্ষণিক মীমাংসার চেষ্টা করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে।”

Share This Post

শেয়ার করুন

Author:

Note For Readers: The CEO handles all legal and staff issues. Claiming human help before the first hearing isn't part of our rules. Our system uses humans and AI, including freelance journalists, editors, and reporters. The CEO can confirm if your issue involves a person or AI.