Monday, June 30, 2025

গণতন্ত্রের পথে অভিযাত্রা: নতুন বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা

বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যাত্রা এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে রয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট হাসিনা সরকারের পতনের পর নতুন বাংলাদেশে নির্বাচন আয়োজনের তারিখ নির্ধারণ নিয়ে আলোচনা চলছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নির্বাচনের তারিখ, পদ্ধতি, সংবিধান সংস্কার, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের পুনর্গঠন, এবং পতিত ফ্যাসিবাদী শাসকগোষ্ঠীর দ্রুত বিচার নিয়ে মতভেদ রয়েছে। তবে আশা করা যায়, রাজনৈতিক দলগুলো এই মতভেদ অতিক্রম করে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাবে।

বিশ্বে প্রধানত তিন ধরনের গণতন্ত্র দেখা যায়: প্রেসিডেন্ট পদ্ধতি, সংসদীয় পদ্ধতি, এবং আধা-প্রেসিডেন্ট পদ্ধতি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রেসিডেন্ট পদ্ধতির, গ্রেট ব্রিটেন সংসদীয় পদ্ধতির, এবং ফ্রান্স আধা-প্রেসিডেন্ট পদ্ধতির আদর্শ উদাহরণ। ফ্রান্সে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা উল্লেখযোগ্য হলেও, ব্রিটেনের মতো উদার গণতন্ত্র গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। ফ্রান্সের গণতন্ত্রের পথ ছিল ঘাত-প্রতিঘাতে ভরা। উদাহরণস্বরূপ, তৃতীয় রিপাবলিক (১৮৭০-১৯৪০) ৭০ বছরে ১৬০ বার মন্ত্রিসভার পতন দেখেছে। আমলাতন্ত্রের প্রাধান্য এবং দেশপ্রেমিক আমলাদের নির্দেশে দেশ পরিচালিত হলেও এটি দেশকে দুর্বল করতে পারে। তবুও ফ্রান্স ছিল ব্রিটেনের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম সাম্রাজ্য। ফ্রান্সের চতুর্থ রিপাবলিক (১৯৪৬-১৯৫৮) ১২ বছরে ২০টি মন্ত্রিসভার পতন দেখেছে। এটি প্রমাণ করে ভোট থাকলেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় না। বাংলাদেশে ভোট ও গণতন্ত্রকে সমার্থক মনে করা ভুল। আধুনিক ফ্রান্সের জনক জেনারেল দ্য গোল ১৯৫৮ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে আধা-প্রেসিডেন্ট পদ্ধতি প্রবর্তন করেন, যা মন্ত্রিসভার স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে। পাকিস্তানে জেনারেল আইয়ুব খান এবং বাংলাদেশে জিয়াউর রহমান ও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এই পদ্ধতি গ্রহণ করেন। ১৯৯১ সালে এরশাদের পতনের পর সংসদীয় পদ্ধতি প্রবর্তিত হলেও তা গণতন্ত্রকে সুসংহত করতে পারেনি। ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তিত হলেও, ২০১১ সালে শেখ হাসিনার সরকার তা বিলুপ্ত করে। এরপর তিনটি জোরপূর্বক নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি স্বৈরশাসক হয়ে ওঠেন। ২০২৪ সালে তার পতনের পর গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের যাত্রা শুরু হয়েছে। অতিরিক্ত রাজনৈতিক দলের কারণে সরকার অস্থিতিশীল হতে পারে। দ্বিদলীয় ব্যবস্থা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ২২তম সংশোধনীর মাধ্যমে প্রেসিডেন্টের মেয়াদ দুইবারে সীমিত করা হয়েছে। বাংলাদেশেও প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিত করার আইন প্রয়োজন। দলের মধ্যে গণতন্ত্রের অভাব জাতীয় গণতন্ত্রকে বাধাগ্রস্ত করে। ব্রিটিশ শাসন থেকে বাংলাদেশ ভোটের রাজনীতি গ্রহণ করেছে। ২০১৬ সালের ব্রেক্সিট গণভোটে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন জনমতের বিপক্ষে ফলাফলের পর পদত্যাগ করেন, যা দলীয় গণতন্ত্রের উদাহরণ। বাংলাদেশে এমন গণতান্ত্রিক চর্চার অভাব রয়েছে। ব্রিটিশ শাসনামলে স্থানীয় নির্বাচনে বিশিষ্ট নেতারা অংশ নিয়েছিলেন। তবে স্থানীয় ও জাতীয় শাসনের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। বর্তমানে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ নিজস্ব নীতিমালা প্রণয়ন করতে পারে। গণতন্ত্রের ভিত্তি হলো জনমত, নিরপেক্ষ ভোট, এবং জনআকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন। নির্বাচনের পরও জনঅসন্তোষ থাকলে গণতন্ত্র টিকে না। বাংলাদেশে দ্বিদলীয় গণতন্ত্র গড়ে ওঠেনি, এবং হাসিনার পতনের পর রাজনৈতিক দলগুলোর গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দাবি সামনে এসেছে। তবে কোন ধরনের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। রক্তাক্ত রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেশ গড়ার রাজনীতির দিকে এগিয়ে যাওয়া প্রয়োজন।

Share This Post

শেয়ার করুন

Author:

Note For Readers: The CEO handles all legal and staff issues. Claiming human help before the first hearing isn't part of our rules. Our system uses humans and AI, including freelance journalists, editors, and reporters. The CEO can confirm if your issue involves a person or AI.